মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদী। ছবি: সংগৃহিত
সারাদেশ

গভীর রাতে আড়িয়াল খাঁয় ড্রেজার, ঘরবাড়ি হারাচ্ছে অর্ধশত পরিবার 

মাদারীপুর  প্রতিনিধি

একসময় আড়িয়াল খাঁ নদী ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভরসা। নদীর পানি ও পলিতে উর্বর হতো কৃষিজমি, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে ঘিরে চলত বহু পরিবারের সংসার। সেই নদীই এখন তীরবর্তী মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। অভিযোগ উঠেছে, রাতের আঁধারে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে নদীর তীরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে বসতভিটা, ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক পরিবার। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক পরিবার।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া ও চরহোগলপাতিয়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে সরেজমিনে গিয়ে ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাতের বেলায় নদীতে ড্রেজার বসিয়ে তলদেশ থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশ ও তীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব সরদার অভিযোগ করে বলেন, একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। ড্রেজার দিয়ে বালু কাটার কারণেই নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধ করা না হলে আরও অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

জমি হারিয়ে অন্যের জায়গায় আশ্রয়

হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকনের জীবনও নদীভাঙনে বদলে গেছে। একসময় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন তিনি। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে তাঁর জমি নদীতে বিলীন হতে শুরু করে। একপর্যায়ে পারিবারিকভাবে পাওয়া দুই বিঘা জমির পাশাপাশি বসতভিটাটুকুও নদীগর্ভে চলে যায়। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন এনামুল।

তিনি বলেন, “ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার পর থেকেই নদীটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করতেও ভয় লাগে। যারা এসব করছে, তারা খুব প্রভাবশালী। এখন আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।”
ফসলি জমি থেকে বসতভিটা—সবই গেছে নদীতে

একই গ্রামের বাসিন্দা টিটল আকনের গল্পও প্রায় একই। নদীভাঙনে তাঁর গোলাভরা ধান, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি—সবই হারিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত নদীর ওপারে নিজের সামান্য ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন তিনি।
টিটল আকন বলেন, আগে এই এলাকায় নদীভাঙনের এমন ভয়াবহতা দেখা যেত না। ড্রেজার বসানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভয়ে স্থানীয়দের অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

সন্ধ্যার পর শুরু হয় বালু উত্তোলন

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের অধিকাংশ সময় সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত আড়িয়াল খাঁ নদীর বিভিন্ন অংশে দুই থেকে তিনটি ইঞ্জিনচালিত ড্রেজার দিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। এসব ড্রেজারের সঙ্গে থাকে বালু পরিবহনের নৌযানও।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে দিনের বেলায় ড্রেজার ও বালুবাহী নৌযানগুলো অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়। ফলে দিনের বেলায় সরেজমিনে গিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা এই বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত—এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অনেকেই প্রকাশ্যে কারও নাম বলতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের ভয়ে প্রতিবাদ করাও কঠিন।

অর্ধশত পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে

স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক পরিবার নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা ও জমি হারিয়েছে অথবা সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিনই নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে সামনে আরও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে হোগলপাতিয়া ও চরহোগলপাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয়রা অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ, নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শুভ সরকার বলেন, “পানির স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর প্রতিটি বাঁকেই ভাঙন দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সমীক্ষা চলছে। অচিরেই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
রাতের আঁধারে ড্রেজার ব্যবহার করা হলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের আশ্বাস

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মিজ্ মর্জিনা আক্তার বলেন, “নদীভাঙন মাদারীপুর জেলার একটি বড় সমস্যা। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। নদীভাঙন রোধে সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে তিনি কয়েকটি ভাঙনকবলিত এলাকা সরাসরি পরিদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সরকারের কাছে ছবি পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের নিয়ে সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

মুন্সীগঞ্জ যুবদল নেতা সোহাগের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দলের নীতি ও আদর্শ পরিপন্থী ক...

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভি...

সুন্দরবনে ৩ দিনে ঘুরে গেলেন ৩ হাজার পর্যটক

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দূর্গা...

গর্ভবতী নারীকে অবহেলা স্বজনদের, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত সন্তান প্রসব

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চ...

সংস্কারের অভাবে নষ্টের পথে ফুলবাড়ী মাইক্রোওয়েভ স্টেশন

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ...

মুন্সীগঞ্জে ৩ কেজি গাঁজাসহ নারী গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতু উত্তর থানার খানবাড়ি বাসস্ট...

স্কুলের গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে

কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই স্কুলের ৪টি গাছ কেটে ফেলা...

‘শেখ হাসিনা আসছে’ স্লোগানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল

লক্ষ্মীপুরে ‘শেখ হাসিনা আসছে’ স্লোগান...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা