ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও ইরানের সরকার পরিবর্তনের কথা সামনে এনেছেন। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তার এই বক্তব্য নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরে বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি করার সক্ষমতা ইসরায়েলের থাকলেও, সেই শক্তিকে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত করা অত্যন্ত কঠিন।
আকাশে শক্তির প্রদর্শন, কিন্তু লক্ষ্য অনেক দূরের : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইসরায়েল চাইলে বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। দেশটির উন্নত যুদ্ধবিমান, দীর্ঘপাল্লার হামলা পরিচালনার সক্ষমতা এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এমন অভিযান পরিচালনা করা তাদের জন্য সম্ভব। তবে কেবল আকাশ থেকে হামলা চালিয়ে কোনো দেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না। সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা গেলেও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে, বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কার্যকর থাকে।
সরকার পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা : বিশ্লেষকদের মতে, সরকার উৎখাতের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু বোমাবর্ষণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থল উপস্থিতিও প্রয়োজন হয়। ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য বহু সময় সেনা মোতায়েন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দরকার হয়েছে।
ইরানের মতো বড় ও জনবহুল দেশে এমন অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সেখানে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।
গোপন অভিযান কতটা কার্যকর : ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা অতীতে ইরানের ভেতরে বিভিন্ন গোপন অভিযান পরিচালনা করেছে বলে বহুবার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব নেটওয়ার্ক ও কৌশল বারবার ব্যবহার করলে সেগুলো উন্মোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ইসরায়েলের হাতে ইরানের সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি করার সক্ষমতা থাকলেও, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তেহরানের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে ফেলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সাইবার হামলা কিংবা গোপন গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি করা সম্ভব হলেও, শুধুমাত্র এসব পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কার্যকর পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
ইরানও পুরোপুরি অসহায় নয়
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে আঘাত পেলেও ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। দেশটির হাতে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে, যা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো ইরানের সামরিক সম্পদকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়। ফলে বড় ধরনের হামলার পরও দেশটি পাল্টা আঘাত হানার কিছু সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি চাপ
ইরানের তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং অর্থনৈতিক ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইসরায়েলের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কি আবার সরাসরি যুক্ত হবে?
ইরানের গভীরে থাকা কিছু কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত হানতে যে ধরনের ভারী বাংকার-বিধ্বংসী অস্ত্র প্রয়োজন, তার অনেকগুলোর সক্ষমতা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের জন্য কিছু লক্ষ্যবস্তুতে কার্যকর হামলা চালানো কঠিন হতে পারে।
তবে মার্কিন রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় নতুন করে বড় সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ মার্কিন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়া ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে আরও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে।
ইসরায়েলের কাছে ইরানে ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সামর্থ্য রয়েছে, এ বিষয়ে সন্দেহ কম। কিন্তু সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন এক জিনিস নয়। ইরানের সরকার পরিবর্তনের মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু বিমান হামলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সামরিক-রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োজন হবে।
ফলে মূল প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত: ইসরায়েল কি ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারবে, নাকি সত্যিই দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে? বর্তমানে অধিকাংশ বিশ্লেষক দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেই বেশি অনিশ্চিত বলে মনে করছেন।
সান নিউজ / রাজীব