সান নিউজ/এআই
মতামত
আশার সনদ নাকি আরেক প্রহসন?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় জুলাই সনদের হিসাব–নিকাশ

শেখ আফিফ ওমর

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ এক নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রের কাঠামো ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। নানা সময়ে সামরিক শাসন, দলীয় কর্তৃত্ব, সাংবিধানিক সংশোধন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের জনগণের আস্থা ক্ষয় করেছে। এমন বাস্তবতায় জুলাই সনদকে অনেকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এটি আরেকটি রাজনৈতিক দলিল হয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।

জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনীতিতে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক করে গড়া। এতে প্রস্তাব করা হয়েছে প্রশাসনিক সংস্কার, সাংবিধানিক পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, এবং নাগরিক মতামত সংগ্রহের জন্য গণভোট বা জনগণপরামর্শ ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই প্রস্তাবগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে একটি ইতিবাচক চিন্তা।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক। নীতির চেয়ে আনুগত্য, এবং জনগণের চেয়ে দলীয় স্বার্থ এখানে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এমন এক প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সহজ হবে না। এটি কেবল একটি প্রস্তাব বা সনদ নয়; এটি কার্যকর করতে হলে দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ। ইতিহাস বলছে, দেশের প্রায় সব সংস্কারই ব্যর্থ হয়েছে যখন তা কেবল একপক্ষের স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে।

জুলাই সনদের একটি বড় শক্তি হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। এতে দল, নাগরিক সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এটি যদি সত্যিকার অর্থে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত হয়, তবে দেশের গণতন্ত্র আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। নাগরিকরা নিজেদের মতামত প্রকাশে সাহসী হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারবে। ফলে রাজনীতি আর কেবল রাজনীতিবিদদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি হবে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া।

তবে বিপরীত দিকও আছে। সংবিধান সংশোধন বা প্রশাসনিক কাঠামো বদলানোর মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়া সঠিক প্রস্তুতি ও ঐকমত্য ছাড়া শুরু হলে তা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতার পরিবেশে এমন কোনো উদ্যোগ যদি একপক্ষীয়ভাবে চালানো হয়, তাহলে তা সংস্কারের পরিবর্তে বিভক্তি বাড়াতে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে, সংস্কারের নামে নানা সময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মূল শর্ত হওয়া উচিত স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ।

এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অধিকাংশ নাগরিক এখনো রাজনীতির জটিল ভাষা ও আইনি কাঠামো সম্পর্কে অবহিত নন। যদি তারা না জানেন জুলাই সনদে কী পরিবর্তন আসছে, তাহলে তা জনসমর্থন পাবে না। সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন মানুষ বুঝবে এটি তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে। যেমন, নির্বাচনে প্রভাব কমবে কি না, প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়বে কি না, দুর্নীতি কমবে কি না- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে না পারলে সনদের প্রতি আস্থা তৈরি হবে না।

তবে আশার বিষয় হচ্ছে, এই সনদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন জনগণ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষকে ভাবাচ্ছে। তারা চায় এমন একটি কাঠামো, যেখানে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সত্যিই জনগণের হাতে থাকবে। জুলাই সনদ সেই আশার প্রতীক হতে পারে, যদি তা কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের জন্য হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদের বাস্তবায়নে যেন আইন ও সংবিধানের সীমা অতিক্রম না করা হয়। বিচার বিভাগ ও সংসদ- এই দুই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সংস্কার করতে হবে। যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে সনদটি ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। জনগণ তখন এটিকে আরেকটি রাজনৈতিক নাটক হিসেবে দেখবে, এবং পরিবর্তনের আশা আবারও ভেঙে পড়বে।

সবশেষে বলা যায়, জুলাই সনদ একটি সুযোগ, কিন্তু সেটি ব্যবহারের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সচেতন নাগরিক সমাজের হাতে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনের সংস্কার সম্ভব, জবাবদিহি বাড়বে, এবং গণতন্ত্র আরও শক্ত হবে। জনগণ তখন রাজনীতির দর্শক নয়, অংশীদার হবে। কিন্তু যদি এটি কেবল নতুন স্লোগান বা দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে পড়ে, তবে এর কোনো স্থায়ী প্রভাব থাকবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সনদ সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো পারস্পরিক আস্থা ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মানসিকতা। যদি সব পক্ষ বুঝতে পারে যে পরিবর্তন মানে জয়-পরাজয় নয়, বরং নতুন সূচনা, তাহলে জুলাই সনদ ইতিহাসে একটি ইতিবাচক মোড় আনতে পারে। কিন্তু যদি এটি কেবল ক্ষমতার নতুন কৌশল হয়ে ওঠে, তবে এটি কেবল আরেকটি হারানো সম্ভাবনার গল্প হিসেবেই রয়ে যাবে।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মুন্সীগঞ্জে সাবেক যুবলীগ নেতা খাইরুদ্দিন গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে ছাত্র হত্যা মামলার আসামি সাবেক যুবলীগ...

মুন্সীগঞ্জে বন্দুক, গুলি, ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ১

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার খাসকান্দি এলাকায় অভিযান চাল...

৮ শতাধিক মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিলো সেনাজোন 

পাহাড়ে নিম্ম আয়ের ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্...

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ ছন্দে বিসিবি একাদশ

বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটির (এবিজি স্পোর্টস সিটি) আধুনিক আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম...

নুসরাত ফারিয়ার ‘লাপাত্তা’ ও ‘লজ্জা’ আসছে

চলতি বছর ‘লোকে বলে’ গান দিয়ে সংগীতাঙ্গনে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছি...

ইনানীর ট্র্যাজেডির ছয় দিন পর ফের আতঙ্ক

কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা...

গিটারের সুর থামিয়ে না ফেরার দেশে রাসেল খান

বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের পরিচিত গিটারবাদক রাসেল খান আর নেই। দীর্ঘ তিন দশকেরও...

জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজায় প্রশংসা, সামনে নতুন পরীক্ষার মুখে সরকার

জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সরকারি সহযোগিতার মধ্য দি...

এএফসির সমর্থনে শক্ত অবস্থানে ইনফান্তিনো

ফিফা সভাপতির আসনে আরও এক মেয়াদ থাকার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেলেন জিয়ান্ন...

পদোন্নতি পেলেন হাসনাত-সারজিস-আসিফ-নাসীরুদ্দীন

সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করেছে জাতীয় ন...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা