ছবি: সংগৃহিত
জাতীয়

নদীর নাব্য সংকটে খুলনা নদীবন্দরে পণ্য খালাস অর্ধেকে, বিপাকে ব্যবসা-শ্রমিক

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নদীপথ। এই পথ ব্যবহার করেই মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে সার, কয়লা, পাথর, চালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য লাইটারেজ জাহাজে করে খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরে পৌঁছে। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের নাব্য সংকট, ভাঙা ঘাট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখন এই দুই নদীবন্দরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনা নদীবন্দরের একাধিক ঘাট বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও ঘাটের অংশ ধসে গেছে, আবার কোথাও নিরাপদভাবে জাহাজ ভিড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত জেটির অভাব, ওপেন ইয়ার্ডের সীমিত সক্ষমতা এবং নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় বড় আকারের পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না।

একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে নওয়াপাড়া নদীবন্দরেও। সেখানে অনেক জাহাজকে খালাসের জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত নদীতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভাটার সময় নদীর পানি কমে গেলে অনেক জাহাজ নদীর তলদেশে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে, ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে।

খুলনা বিভাগীয় নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির পরিচালক আসিফ আহমেদ জানান, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মোংলা বন্দরে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবও খুলনা অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোতে পড়েছে। তার ভাষ্য, গত দুই বছরে জাহাজের সংখ্যা এবং পণ্য খালাস প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ঘাটশ্রমিকদের জীবনে। একসময় খুলনা ও নওয়াপাড়ার বিভিন্ন ঘাটে দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিয়মিত কাজ করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা ৫০০-এরও নিচে নেমে এসেছে। যাঁরা এখনও কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই মাসের বড় একটি সময় কর্মহীন অবস্থায় কাটাচ্ছেন।

খুলনা নদীবন্দরের শ্রমিক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আগে প্রায় প্রতিদিনই জাহাজ আসত এবং নিয়মিত কাজ মিলত। কিন্তু গত দুই বছর ধরে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন সপ্তাহ পার হলেও অনেক সময় কোনো কাজ মেলে না, ফলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরেক শ্রমিক মো. রুবেল শেখ জানান, আগের তুলনায় আয় অর্ধেকেরও কমে গেছে। অনেক সহকর্মী বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। যারা এখনও এই পেশায় আছেন, তারাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

খুলনা অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, নদীপথে পণ্য পরিবহনের ওপর ব্যয় বাড়লেও বন্দরের সক্ষমতা ক্রমেই কমছে। তার মতে, দ্রুত নদী ড্রেজিং, নিরাপদ জেটি নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত ঘাট সংস্কার এবং আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা চালু করা না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য আরও বড় সংকটে পড়বে।

অন্যদিকে খুলনা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ জানান, বন্দরের নাব্য উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাসের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ অর্থবছরে খুলনা নদীবন্দর থেকে প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং নওয়াপাড়া নদীবন্দর থেকে ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্ব আদায় অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে নদীবন্দরগুলোর কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীপথ বাংলাদেশের অন্যতম সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা। তাই খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত ড্রেজিং, আধুনিক জেটি নির্মাণ, ঘাট সংস্কার এবং নিরাপদ নৌ-অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য, শিল্প এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভি...

চারতলা ভবন থেকে নিচে পড়ে নারীর মৃত্যু

মৌলভীবাজার শহরে অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে আসবাবপত্রসহ...

গর্ভবতী নারীকে অবহেলা স্বজনদের, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত সন্তান প্রসব

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চ...

রাজধানীর বাজারে ছুটির আমেজ, মুরগির দামে ঝাঁজ, ডিমে মিলছে স্বস্তি

পূজার ছুটির আবহ এখনো কাটেনি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। অনেক স্থানে ক্রেতার উপস্...

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের ফ্ল্যাট জব্দ

লন্ডনে দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন যুক্ত...

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে...

জাপানি বিদ্রোহী ঔপন্যাসিক রিউ মুরাকামি আর নেই

এক নজরে রিউ মুরাকামি ও তার সাহিত্যিক অবদান

সরকারের ভুলে নীরব থাকবে না বিরোধী দল : ডা. শফিকুর রহমান

বর্তমান সরকারের একের পর এক অনিয়ম, ভুল পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে...

কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!

এক নজরে কলা চাষের বর্তমান সংকট ও নতুন সম্ভাবনা

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা