বর্তমান সরকারের একের পর এক অনিয়ম, ভুল পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে ও রাজপথে শক্ত অবস্থান বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে বিরোধী দল কখনোই হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। সরকারের কোনো ইতিবাচক কাজের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা হটকারী পদক্ষেপ দেখলে গঠনমূলক ও কঠোর সমালোচনা চালিয়ে যাবে তাদের দল।
আজ শনিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লাগামহীন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের প্রবণতা, সংবাদমাধ্যমের আচরণ, প্রবাসী কর্মীদের অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় রাজনীতির সমসাময়িক নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি।
রাজনীতির পুরোনো ও গতানুগতিক ধারা বদলে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর জোর দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে সরকারি দলের প্রতিটি কাজের অন্ধ প্রশংসা অথবা বিরোধী দলের সব পদক্ষেপকে বিনা বাক্যে প্রত্যাখ্যান করার রেওয়াজ ছিল।
অনেকে হয়তো এখনো এমনটিই আশা করেন যে বিরোধী দল সংসদে ভাঙচুর চালিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করুক কিংবা সরকারি দলের যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্তে অন্ধভাবে সায় দিক। তবে জামায়াত এই দুই চরমপন্থী ধারার কোনোটিকেই সমর্থন করে না। বরং সংসদে একটি দায়িত্বশীল, প্রজ্ঞাবান ও গঠনমূলক বিরোধী শক্তির আদর্শ স্থাপন করতে চায় তারা।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদকদ্রব্যের অবাধ বিস্তার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পুলিশ প্রশাসনের ভেতর অসংখ্য দেশপ্রেমিক ও কর্মঠ কর্মকর্তা কাজ করে যাচ্ছেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে যে মাত্রার সফলতার প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা ও নজরদারি আরও বহুগুণ বাড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন অনিয়মের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, জেলা পরিষদগুলোতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পুনর্বাসিত না করে কেন নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হলো না? পাশাপাশি সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের যে অভিযোগ উঠছে, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
দেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, অপরাধী, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজরা কোনো দলেরই প্রকৃত সম্পদ হতে পারে না; বরং এ ধরনের দুষ্কৃতকারীরা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ ধরনের অপরাধীদের দমনে বর্তমান প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
সংসদ সদস্য বা সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ উঠলেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে কাউকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু জেনেশুনে অপরাধ করলে তাকে কোনোভাবেই মাফ করা যায় না।
নিজের দলের এক সাংসদকে বহিষ্কারের ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, নীতিগত আপসের প্রশ্ন আসায় দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ওই নেতাকে দল থেকে নিষ্কৃতি দিতে চব্বিশ ঘণ্টাও সময় নেওয়া হয়নি। বর্তমানে ওই ব্যক্তির সঙ্গে দলের কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে চলা নানা অন্যায় ও অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমের সাহসিকতার মাধ্যমেই জনসমক্ষে আসে। তবে অতীতে দেশে একদলীয় বা ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হওয়ার পেছনে কিছু ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকা বা নীরবতার দায়ও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিদেশের মাটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে জামায়াত আমির জানান, একাই সৌদি আরবের কারাগারে বিভিন্ন অপরাধে সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় আইনকানুন অনুযায়ী তাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া স্বাভাবিক হলেও, বন্দিদের সঠিক আইনি সহায়তা ও তারা ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না—তা তদারকি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে দলের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোট বা ঐক্যের ব্যানারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে না।
অতীতেও দলটি নিজস্ব স্বতন্ত্র বজায় রেখে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। আগামীতে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মাঠের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সান নিউজ / রাজীব