ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক
ভূরাজনৈতিক সমীকরণের নতুন হিসাব

গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ও বিশ্বজুড়ে তেল আবিবের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক একাকীত্বের মধ্যেই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে ভারত। যেখানে ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা কিংবা নরওয়ের মতো পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে এবং গাজায় নির্বিচার হামলার সমালোচনা করছে, ঠিক উল্টো পথে হেঁটে নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকা ভারতের এই অবস্থান পরিবর্তন কেবল ভূরাজনৈতিক কৌশল নয়, এর পেছনে রয়েছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গভীর সমীকরণ।

ইসরায়েলি মন্ত্রীর ভারত সফর এবং ইউরোপের বিপরীত চিত্র
২০২৫ সালের শেষভাগে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্ব গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর দমনপীড়ন ও দখলদারিত্বের অভিযোগে ইসরায়েলের উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ভারতে উষ্ণ অভ্যর্থনা পান তিনি।

নয়াদিল্লিতে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের স্টক এক্সচেঞ্জ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটের নতুন বিনিয়োগ কেন্দ্র পরিদর্শন—সব জায়গাতেই তাকে সাদরে বরণ করা হয়। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কর্মকাণ্ড থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে, সেখানে ভারত উল্টো ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির সুদৃঢ় বন্ধুতা ও উষ্ণ কোলাকুলি বিশ্বমঞ্চে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।

ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন নীতি থেকে ভারতের সরে দাঁড়ানো
১৯৪৭-৪৮ সালের দিকে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল। উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের উত্তরাধিকার থেকে ভারত ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল এবং ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম জোরালো সমর্থক ছিল।

১৯৭৫ সালে জায়োনিজমকে বর্ণবাদের রূপ বলে পাস হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভারত ভোট দিয়েছিল এবং পিএলও-কে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম অ-বানিজ্যিক রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম ছিল ভারত। ১৯৯২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দীর্ঘ সময় ধরে এই নীতিতে আংশিক ভারসাম্য বজায় রাখা হলেও, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সেই অবস্থান আমূল বদলে যায়।

২০১৬ সালে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন মোদি, যা দুই দেশের সম্পর্ককে গোপন বা অন্তরালের সম্পর্ক থেকে একেবারে প্রকাশ্য ও গভীর বন্ধুত্বের রূপ দেয়।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ইসলামোফোবিয়ার সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণ। ভারতের বর্তমান শাসকদল বিজেপির মূল মতাদর্শ ‘হিন্দুত্ব’-এর সঙ্গে ইসরায়েলি জায়োনিজমের এক ধরনের আদর্শিক মিল খুঁজে পান বিশ্লেষকরা।

যেমনটি ইসরায়েল নিজেকে ইহুদিদের জন্য একমাত্র নিরাপদ ও প্রাকৃতিক আবাসভূমি মনে করে, তেমনি হিন্দু জাতীয়তাবাদীরাও ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াইয়ের মতে, ভারতে মুসলিমবিদ্বেষী বা ইসলামভীতির যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ান রয়েছে, তার সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী নীতি বেশ নিখুঁতভাবে মিলে যায়। অতীতে কংগ্রেস বা অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো মুসলিম ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখে ফিলিস্তিনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিত।

কিন্তু মোদির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ফিলিস্তিন প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক লাভ দেখছে না; বরং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের’ সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে।

সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের একটি বড় চালিকাশক্তি। বর্তমানে ভারত ইসরায়েলের অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা দেশ। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদীপ সুরি জানান, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই বুঝতে পেরেছে যে প্রতিরক্ষা, অস্ত্র কেনাকাটা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইসরায়েল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এক অংশীদার।

এছাড়া দুই দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যেও ইসরায়েলের পেশিশক্তি ও নিরাপত্তা নীতির প্রতি একধরনের নীরব সমর্থন রয়েছে, যা ক্ষমতাসীনদের এই নীতিকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা দেয়।

নীতিহীনতার শঙ্কা ও বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজার ধ্বংসস্তূপ, হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোতে ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে নীরবতা পালন করছে। যেখানে ইউরোপের অনেক দেশ এখন ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে টিকিয়ে রাখতে সোচ্চার হচ্ছে, সেখানে ভারত কেবল দায়সারা কিছু কূটনৈতিক মন্তব্য করেই ক্ষান্ত থাকছে। সামগ্রিক বিবেচনায়, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রথাগত ঐতিহ্য ভেঙে মোদি সরকারের এই ইসরায়েল প্রীতি বিশ্বমঞ্চে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে।

সান নিউজ / রাজীব

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভি...

চারতলা ভবন থেকে নিচে পড়ে নারীর মৃত্যু

মৌলভীবাজার শহরে অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে আসবাবপত্রসহ...

গর্ভবতী নারীকে অবহেলা স্বজনদের, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত সন্তান প্রসব

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চ...

রাজধানীর বাজারে ছুটির আমেজ, মুরগির দামে ঝাঁজ, ডিমে মিলছে স্বস্তি

পূজার ছুটির আবহ এখনো কাটেনি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। অনেক স্থানে ক্রেতার উপস্...

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের ফ্ল্যাট জব্দ

লন্ডনে দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন যুক্ত...

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে...

জাপানি বিদ্রোহী ঔপন্যাসিক রিউ মুরাকামি আর নেই

এক নজরে রিউ মুরাকামি ও তার সাহিত্যিক অবদান

সরকারের ভুলে নীরব থাকবে না বিরোধী দল : ডা. শফিকুর রহমান

বর্তমান সরকারের একের পর এক অনিয়ম, ভুল পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে...

কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!

এক নজরে কলা চাষের বর্তমান সংকট ও নতুন সম্ভাবনা

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা