জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সরকারি সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজা সম্পন্ন হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখা তার জন্য সহজ হবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা এবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে।
বেড়েছে পূজামণ্ডপ, জোরদার ছিল নিরাপত্তা
এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। রাজধানী ঢাকায় ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ।
উৎসব ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ সদস্য মোতায়েন করা হয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আটজন এবং অন্য মণ্ডপগুলোতে ছয়জন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম প্রস্তুত রাখা হয়।
সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে বিজিবি ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করে এবং টহল কার্যক্রম বাড়ায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার তিন দিনের বিশেষ ছুটি ঘোষণা করায় সাপ্তাহিক ছুটিসহ অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা
দুর্গাপূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রশংসা পায়। ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে এত প্রাণবন্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা তিনি আগে দেখেননি।
লেখক, অধিকারকর্মী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকেই এবারের আয়োজনকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাদের মতে, সরকারের সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকার কারণে হিন্দু সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে তাদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পেরেছে।
এ ছাড়া কলকাতার সাংবাদিক ও জনপ্রিয় উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষও বাংলাদেশের পূজামণ্ডপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর সৃজনশীলতা ও জাঁকজমক তাকে মুগ্ধ করেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করেন তিনি।
উদ্বেগ কাটেনি সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে
তবে উৎসবের সফল আয়োজনের পরও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। পূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা এবং সহিংসতার অন্তত ৩৪টি ঘটনার অভিযোগ উঠে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি সারা বছর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকারের অভিযোগ, কিছু ইসলামপন্থী বক্তা এখনো প্রতিমাপূজার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। তার মতে, কেবল উৎসবের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
হিন্দু ভোট ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে হিন্দু ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির প্রতি সমর্থন দেখিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও সেই সমর্থনের একটি কারণ ছিল।
দুর্গাপূজার সফল আয়োজন হিন্দু ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা কিছুটা বাড়াতে পারে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেওয়া বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। ক্ষমতায় গেলে দখল হওয়া মন্দিরের জমি উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি তিনি দেন, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সামনে কঠিন সময়
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুর্গাপূজার সফল আয়োজন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এটিই চূড়ান্ত মূল্যায়নের মানদণ্ড নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সারা বছর নিশ্চিত করতে পারলেই প্রকৃত আস্থা তৈরি হবে।
তাদের মতে, হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা।
দুর্গাপূজার সফল আয়োজন আপাতত সরকারের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও, এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখাতে হবে।
লেখক: দীপ হালদার একজন লেখক এবং দ্যপ্রিন্ট-এর সহযোগী সম্পাদক
সান নিউজ / রাজীব