এক নজরে কলা চাষের বর্তমান সংকট ও নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাপী উৎপাদন: প্রতি বছর প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টন কলা উৎপাদিত হয় (টমেটোর পর দ্বিতীয় সর্বাধিক পঠিত ফল)।
অতীতের ইতিহাস: ১৯৫০-এর দশকে পানামা রোগের আক্রমণে ‘গ্রোস মিশেল’ জাতের কলা বিলুপ্ত হয়ে যায়, যার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল বর্তমানের ‘ক্যাভেন্ডিশ’।
বর্তমান সংকট: ক্যাভেন্ডিশ জাতটি এখন পানামা রোগের নতুন ও আগ্রাসী রূপ ‘টিআর৪’ (ট্রপিক্যাল রেস ৪) এর মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভূগোল ও বিস্তার: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার মতো বড় অঞ্চলে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে (২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইকুয়েডরেও এর বিস্তার দেখা যায়)।
আশার আলো: শীর্ষ কলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘চিকুইটা’ এবং ‘কি-জিন’-এর যৌথ উদ্যোগ ‘ইয়েলোওয়ে’ প্রজননক্ষম ক্যাভেন্ডিশ কলার নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং মারাত্মক সব উদ্ভিদ রোগের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে কলা চাষ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের অত্যন্ত পছন্দের ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা এখন অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে। তবে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন ও নতুন প্রজননপ্রযুক্তি এই সংকট কাটিয়ে ফলটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বিশ্বব্যাপী টমেটোর পরেই সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করা ফল হলো কলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টন কলার ফলন হয়ে থাকে। বিশ্বে কলার সহস্রাধিক ভিন্ন প্রজাতি থাকলেও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বা বাজারের ফলের ঝুড়িতে মূলত ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এর আগে ১৯৫০-এর দশকে ভয়ংকর ‘পানামা রোগ’-এর আক্রমণে জনপ্রিয় ‘গ্রোস মিশেল’ জাতের কলা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের পর ক্যাভেন্ডিশ জাতটি বাজার দখল করে নিয়েছিল।
বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া ক্যাভেন্ডিশ কলা মূলত প্রজননে অক্ষম ক্লোন প্রকৃতির। যার ফলে প্রতিটি গাছের জিনগত গঠন হুবহু একই রকম। এই একঘেয়ে জিন কাঠামোর কারণে পুরো জাতটি যেকোনো একটি নির্দিষ্ট রোগের মুখে পড়লে একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে থাকে।
বর্তমানে এই ক্যাভেন্ডিশ জাতটিও পানামা রোগের অত্যন্ত আগ্রাসী ও নতুন রূপ ‘টিআর৪’ বা ট্রপিক্যাল রেস ৪-এর মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়েছে। নরউইচের আর্লহ্যাম ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট ফসলের জিনোমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. হোসে দে ভেগা জানান, এই রোগটি শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকলেও তা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার মতো বড় বড় অঞ্চলে।
সবচেয়ে শঙ্কার খবরটি সামনে আসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে, যখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কলা রপ্তানিকারক দেশ ইকুয়েডরেও এই রোগের বিস্তার ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছত্রাকজনিত রোগটি বিশ্বজুড়ে কলার সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একই সঙ্গে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবিকাও মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। কারণ, বিশ্বের বহু অঞ্চলের মানুষ তাদের দৈনিক খাদ্য এবং আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল।
জলবায়ু সংকটের নেতিবাচক প্রভাব এবং প্রাণঘাতী রোগবালাইয়ের কারণে গুয়াতেমালা থেকে শুরু করে মালাবি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাসী তাদের অন্যতম প্রধান একটি পুষ্টিকর খাদ্য থেকে চিরতরে বঞ্চিত হতে পারে।
তবে এই সম্ভাব্য মহাবিপর্যয় রোধ করতে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। বিশ্বের অন্যতম প্রধান কলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'চিকুইটা' এবং আধুনিক ফসল উন্নয়ন সংস্থা 'কি-জিন'-এর যৌথ উদ্যোগ 'ইয়েলোওয়ে' ঘোষণা করেছে যে, তারা সফলভাবে প্রজননক্ষম ক্যাভেন্ডিশ কলার একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় সাফল্যের ফলে এখন সংকরায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে রোগপ্রতিরোধী এবং বাণিজ্যিকভাবে অধিক লাভজনক নতুন জাতের কলা উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। ফলস্বরূপ, বিশ্ববাজারে কলার চিরচেনা অবস্থান ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে এক বিশাল বাধা দূর হলো বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব