শিক্ষা

ঢাবি ও স্টকহোম ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ব্ল্যাক কার্বন বিষয়ে উচ্চ-পর্যায়ের নীতি সংলাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্ল্যাক কার্বন এবং অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষক বিষয়ক একটি উচ্চ-পর্যায়ের বিজ্ঞান-নীতি সংলাপ আজ ১ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। ‘ক্লিন এয়ার ফান্ড’-এর সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এই সংলাপ আয়োজন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদি আমিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়াল, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরজান গুস্তাফসন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকার আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪,০০০ মেগাওয়াট (মে.ওয়া.) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এর মধ্যে কেবল ঢাকা শহর থেকেই ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০,০০০ মেগাওয়াট। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ জ্বালানির দিকে রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তির সক্ষমতা বাড়ানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ‘দূষণকারী জ্বালানি’ অবকাঠামো—যেমন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন কয়লা পোড়ানো হয়, যা থেকে বিপুল পরিমাণ ব্ল্যাক কার্বন (কালো কার্বন) নির্গত হয়।

ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইটভাটাগুলো মোট বায়ুদূষণের প্রায় ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী, কারণ এগুলোতে প্রায়শই উচ্চ সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, দূষণ রোধে সরকার সারা দেশে কাঠ পোড়ানো ২০০টি ইটভাটা বন্ধ করে দিচ্ছে এবং সেগুলোর পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। এই পরিবর্তনের ফলে ধোঁয়া নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ হবে এবং কেবল সামান্য শব্দদূষণ অবশিষ্ট থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, কংক্রিট ব্লক উৎপাদনের মাধ্যমে আমরা বায়ুকে দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদি আমিন বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের বিভিন্ন নীতির কারণে জ্বালানি খাত বর্তমানে বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আমরা জ্বালানির উৎসগুলোকে বৈচিত্র্যময় করতে চাই। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যার মধ্যে সৌরশক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পগুলোও বর্তমানে চলমান রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করা। সেই ধারাবাহিকতায়, নতুন উদ্যোগগুলোতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।” শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি এবং বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সিএনজিচালিত যানবাহনের মতো পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রবর্তনের কথা উল্লেখ করে মাহাদী আমিন বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে বিএনপির একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। এছাড়া, বিএনপি সরকার প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহারকে উৎসাহিত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তিনি আরও জানান, বিএনপি সরকার পূর্ববর্তী শাসনামলগুলোতে সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং বৃক্ষ মেলার আয়োজন করেছিল। তিনি বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা সেই সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত ও আরও বিকশিত করতে চাই।”

তিনি বলেন, “আমরা সবাই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস হবে না, বরং প্রকৃতি সংরক্ষিত থাকবে। আমরা এমন সব প্রকল্প ও উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাই, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।” এর কারণ হলো, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্মল ও বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে। তিনি আরও বলেন, এটি অর্জনের জন্য আমাদের সামগ্রিক ও বহুমুখী পরিকল্পনা
র অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, দলটি পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রেখেছে। এটি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করতে সহায়ক হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘ব্ল্যাক কার্বন’ বা কালো কার্বন হলো বায়ুমণ্ডলে ভাসমান অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, যা জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন—ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) বা জৈববস্তুর অসম্পূর্ণ দহনের ফলে উৎপন্ন হয়। জ্বালানি পোড়ানোর সময় পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব থাকলে ব্ল্যাক কার্বন তৈরি হয়। ব্ল্যাক কার্বনের বিশেষ আলোকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে; এটি সৌর বিকিরণ শোষণ করে এবং ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে তোলে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে একটি সফল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে ব্ল্যাক কার্বনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল। সে সময় বায়ুমণ্ডলে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৪০ মাইক্রোগ্রাম। বর্তমানে আমরা নিয়মিত পরিমাপ করে দেখছি যে, এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে। তবে উন্নত বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেখানে এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ১ থেকে ২.৫ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ, আমাদের দেশে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা এখনও ২৫ থেকে ৫০ গুণ বেশি, যদিও আমরা তা উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম হয়েছি। ব্ল্যাক কার্বন আরও কমানোর জন্য আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ব্ল্যাক কার্বন তৈরির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি এবং অন্যান্য উৎস—উভয়ই সমানভাবে দায়ী। ঢাকায় ব্ল্যাক কার্বন কেবল জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণেই তৈরি হয় না, বরং বায়োমাস (যেমন—খড়, কাঠ বা জৈব উপাদান) পোড়ানোও এর নিঃসরণে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া, আন্তঃসীমান্ত দূষণও বাংলাদেশে বায়ুদূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তিনি আরও বলেন, বায়ুদূষণে অবদান রাখে এমন আরও অনেক উৎস রয়েছে।

অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, আমাদের কঠোরভাবে নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া শিল্প ও নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দূরপাল্লার দূষণ পরিবহনের ওপর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। আমাদের সুপারিশ হলো—যানবাহন ও শিল্পের জন্য নির্গমন মানদণ্ড কার্যকর করা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহনের প্রসার ঘটানো, নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ ও সবুজ অবকাঠামো গড়ে তোলা, বায়ুমান ব্যবস্থাপনার জন্য তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং আন্তঃসীমান্ত দূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সুইডেনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতা কৌশলে সবুজ রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কৌশলটি এই বিশ্বাসের প্রতিফলন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে আলাদা পথে না চালিয়ে বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে নেওয়া উচিত। আমাদের দুই দেশের ভবিষ্যতের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সম্ভাবনা। তিনি যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন; কারণ শক্তিশালী অংশীদারিত্ব থেকে উন্নততর ধারণা পাওয়া যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভালো ফলাফল বয়ে আনে। তিনি আগামী দিনগুলোতে এই সহযোগিতাকে আরও গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সাননিউজ/বান্না

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ পেলেন শিবা শানু

ঢাকাই চলচ্চিত্রের পরিচিত খল অভিনেতা চৌধুরী মাজহার আলী ওরফে শিবা শানু দীর্ঘদিন...

গায়ক অন্তুর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলেনি, তদন্তে বেরিয়ে এলো ভিন্ন ঘটনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও উদীয়মান সংগীতশিল্পী আবু জাহিদ অন্তুর বিরুদ্...

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাশের হার ৫২.১২ শতাংশ

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত...

যশোর বোর্ডে গত ৪ বছরের মধ্যে এইচএসসিতে পাসের হার সর্বনিম্ন

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় যশোর শিক্ষা বো...

ঢাবি ও স্টকহোম ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ব্ল্যাক কার্বন বিষয়ে উচ্চ-পর্যায়ের নীতি সংলাপ

ব্ল্যাক কার্বন এবং অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষক বিষয়ক একটি উচ্চ-পর্যায়ের...

রুয়েটে শুরু হলো আন্তঃহল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট)...

উলিপুরে ২৬৮ স্কুলের ২০০টিতেই প্রধান শিক্ষক শূন্য

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় প্রায় ২০০ সরকারি প্রাথম...

ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনে বাজার পরিদর্শনে রাসিক প্রশাসক

রাজশাহী নগরীর বিনোদপুর এলাকায় ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা