সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন বিকেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট পেয়েছে এমন এক ইনিংস, যা বহু বছর মনে রাখার মতো। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে নিজের প্রথম শতককে দ্বিশতকে রূপ দিয়েছেন তাওহিদ হৃদয়। সকালে লাঞ্চের আগে যে ব্যাটার ক্যারিয়ারের প্রথম তিন অঙ্ক ছুঁয়েছিলেন, দিনের শেষ সেশনে এসে তিনি দাঁড়িয়েছেন দুশো ছাড়ানো এক অবিশ্বাস্য ইনিংসের চূড়ায়।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১০৩.৫ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ৩৫১ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রান পেরোতে এখনো ৫ রান দরকার স্বাগতিকদের। হাতে আছে মাত্র দুটি উইকেট, আর ক্রিজে হৃদয়ের সঙ্গী তাসকিন আহমেদ।
বিরল কীর্তি: প্রথম শতকই দুশো
বিকেল ৩টা ৯ মিনিটে ১০১ ওভারে দলের রান যখন ৮ উইকেটে ৩৪০, তখন দুশো রানের মাইলফলকে পৌঁছান হৃদয়। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। অভিষেক টেস্ট শতককেই দ্বিশতকে বদলে দেওয়ার কৃতিত্ব এর আগে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের ছিল না।
বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে দ্বিশতকের দেখা পেলেন হৃদয়। তার আগে এই কীর্তি গড়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান।
ছক্কার রেকর্ডও এখন হৃদয়ের :
দ্বিশতকের পথে হৃদয় উড়িয়েছেন ৮টি ছক্কা। টেস্টের এক ইনিংসে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এত বেশি ছক্কা এর আগে ছিল না। এই রেকর্ডও তাই এখন তার দখলে। ইনিংসে হৃদয়ের চারের সংখ্যা ২০টি পেরিয়ে গেছে।
একা লড়াই, লেজ নিয়ে সংগ্রাম :
হৃদয়ের ইনিংসকে বিশেষ করে তুলেছে এর প্রেক্ষাপট। দলের সব বিশেষজ্ঞ ব্যাটার আউট হয়ে যাওয়ার পর, অর্থাৎ মেহেদী হাসান মিরাজ ফিরে যাওয়ার পর, বাকি রানের বড় অংশটাই এসেছে তার ব্যাট থেকে। ওই সময়ের পর থেকে একাই তুলেছেন ১৩১ রান। ওপাশে একের পর এক নিচের সারির ব্যাটারকে সঙ্গে নিয়ে দলকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।
দ্বিশতকের কাছাকাছি সময়ে, ৯৮.৪ ওভারে দলের রান ছিল ৩২৪। তখন তাসকিনকে নিয়ে গড়া জুটিতে এসেছিল ২৭ রান, আর হৃদয় ছিলেন দুশো থেকে ৬ রান দূরে। সেই ছোট্ট জুটি থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন তিনি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে অস্ত্র কমে এসেছে :
বিকেলের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল অনেকটাই দিশেহারা। বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান ৩৯ ওভারে ৯৪ রান দিয়ে চার উইকেট নিয়েছেন, কিন্তু তার বল মাঝেমধ্যে বাঁক খেলেও হৃদয়কে থামানো যায়নি। এদিকে জশুয়া বিশপ ১৪ ওভারে ৫২ রান দিয়েও উইকেটের দেখা পাননি।
কখনো কাট, কখনো ড্রাইভ, আবার কখনো পা বাড়িয়ে ইনসাইড-আউট শটে চার, সব ধরনের শটেই ছিল হৃদয়ের দাপট। ১০৩তম ওভারের চতুর্থ বলে ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে এসে এক্সট্রা কভার দিয়ে যে চারটি মারেন, সেটি দেখে ধারাভাষ্যকারেরাও মুগ্ধ হয়েছেন। ওয়ারিকানের বিপক্ষে তিনি ছিলেন পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ, কখনো এতটুকু তাড়াহুড়ো করেননি।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী হৃদয়ের নামের পাশে জমেছে ২১৮ রান। তাসকিন ৩ রানে ব্যাট করছেন। দুজনের জুটি এরই মধ্যে পঞ্চাশ রান ছাড়িয়েছে। দিনের আরও প্রায় ২৬ ওভার বাকি, তাই এই জুটি যত লম্বা হবে, বাংলাদেশ ততই ঘাটতি পেরিয়ে লিড পাওয়ার দিকে যেতে পারবে।
হৃদয়ের ইনিংস নিয়ে দেশের বাইরেও চলছে উচ্ছ্বাস। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক সমর্থক লিখেছেন, ভোর ৪টায়ও ঘুম আসছে না, কারণ এমন ঐতিহাসিক ইনিংস মিস করতে চান না। অন্য এক পাঠক তাকে আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটের উপযুক্ত ব্যাটার বলে প্রশংসা করেছেন এবং আশা করেছেন, বাংলাদেশ তাকে সাদা বলের পাশাপাশি লাল বলেও যত্নে গড়ে তুলবে।
এই ইনিংসের আগে সাম্প্রতিক এক প্রথম শ্রেণির ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা এ দলের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৫০ রান করেছিলেন হৃদয়। সেই ছন্দ যে টেস্টেও অটুট, সিলেটের মাঠে তা-ই দেখিয়ে দিলেন তিনি।
এখন সবার চোখ একটাই প্রশ্নে: ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রান ছাড়িয়ে বাংলাদেশ কতটা লিড নিতে পারে। হৃদয় ক্রিজে থাকলে সেই সম্ভাবনা বেশ জোরালো। আর তা হলে সিলেট টেস্ট শুধু একটি ম্যাচ হিসেবে নয়, হৃদয়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংসের স্মৃতি হিসেবে।
সান নিউজ / রাজীব