মূল হাইলাইটস
ভেটো ছাড়া স্থায়ী পদ অগ্রহণযোগ্য : ভারতের সাফ বার্তা—নতুন স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা না দিয়ে কেবল ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’র সদস্যে পরিণত করার প্রচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ক্ষমতার সমতা ও ন্যায়বিচার : নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের পর প্রতিটি স্থায়ী সদস্যের হাতে সমান অধিকার ও ভেটোর ক্ষমতা থাকা আবশ্যিক বলে জানিয়েছে দিল্লি। বর্তমান কাঠামোর সীমাবদ্ধতা : বর্তমানে ভেটোর একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং চীনের হাতেই কুক্ষিগত রয়েছে। ভারতের জোরালো অবস্থান: রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ভারতের স্থায়ী দূত হরিশ পর্বতানেনি স্পষ্ট করেছেন যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হাতে না থাকলে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো অর্থ হয় না।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বর্তমান যুগের বৈশ্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পুরনো দিনের কাঠামোগত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার দিন ফুরিয়ে আসছে। জাতিসংঘের মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের যুক্তিসংগত ও দীর্ঘদিনের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছে ভারত।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুষ্ঠিত ‘ভেটো’ সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কসভায় ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কাঠামোগত সংস্কারের নামে কেবল প্রতীকী বা নামমাত্র স্থায়ী সদস্যপদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
যদি নতুন স্থায়ী সদস্যদের ভেটোর মতো চূড়ান্ত ক্ষমতার বাইরে রেখে কেবল ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ সদস্য হিসেবে বসিয়ে রাখা হয়, তবে তা বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পরিহাস ছাড়া আর কিছুই হবে না।
ভেটো ছাড়া স্থায়ী পদের ফাঁদ ও ভারতের কঠোর বার্তা : বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং চীন—এই পাঁচটি দেশের হাতেই কুক্ষিগত রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা। এর পাশাপাশি ঘূর্ণায়মান ভিত্তিতে দুই বছরের মেয়াদে ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশ কাজ করলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভেটো প্রয়োগের অধিকার থাকে না।
এরকম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পর্বতানেনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের প্রকৃত সংস্কার তখনই সফল বলে বিবেচিত হবে, যখন নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রতিটি স্থায়ী সদস্য দেশের হাতেই বর্তমান পাঁচ মহাশক্তির সমকক্ষ ভেটো ক্ষমতা অর্পণ করা হবে।
দিল্লি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল চাবিকাঠি যদি আগের মতো কেবল ঐতিহ্যগত ৫টি দেশের হাতেই বন্দি থাকে, তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বা প্রকৃত সংস্কার কখনোই অর্জিত হবে না। নতুন সদস্যদের যদি নীতি নির্ধারণের মূল জায়গা থেকে বঞ্চিত করে কেবল নামমাত্র স্থায়ী তকমা দেওয়া হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রহসন হবে।
কেন রাষ্ট্রসংঘের স্থায়ী সদস্য পদের একচ্ছত্র ও যোগ্যতম দাবিদার ভারত : বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে ভারত কেবল নিজের অধিকারের জন্যই লড়াই করছে না, বরং সমগ্র বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী আসন পাওয়ার দাবির পেছনে রয়েছে অনস্বীকার্য কিছু ঐতিহাসিক, ভূ-রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি:
জনসংখ্যা ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব : বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী ভারতকে নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ আসন থেকে বঞ্চিত রাখা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক বিরাট ত্রুটি। বিশ্বের একষট্টি শতাংশ মানুষের কোনো সরাসরি সিদ্ধান্তমূলক অংশীদারিত্ব নেই নিরাপত্তা পরিষদে।
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তায় ঐতিহাসিক অবদান : জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে দশকের পর দশক ধরে সবচেয়ে বেশি সেনা ও নিরাপত্তা কর্মী পাঠিয়ে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে ভারত। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দিল্লি যে বলিষ্ঠ রক্ত ও শ্রম বিনিয়োগ করেছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ণ নৈতিক অধিকার ভারতের রয়েছে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তি : বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভারত। বিশ্ব বাজারে সাপ্লাই চেইন রক্ষা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক সংকটকালীন সময়ে মানবিক সহায়তা প্রদানে বিশ্বনেতার ভূমিকা পালন করছে ভারত।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা : আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রথম সারির দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোর অভাবে বিশ্বমঞ্চে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। ভারতের মতো একটি দায়িত্বশীল ও পরমাণু শক্তিধর গণতান্ত্রিক দেশ স্থায়ী সদস্য হলে তা এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কার এবং স্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে ভারত ও তার সমমনা দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক অধ্যায়। এই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল, জার্মানি, ভারত এবং জাপান—এই চার অর্থনৈতিক পরাশক্তিকে নিয়ে গঠিত ‘জি-ফোর’ (G4) জোট একে অপরের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে জোরালোভাবে সমর্থন জানিয়ে আসছে।
১৯৯৪ সালে গঠিত এই জোটে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ভারসাম্যে নিজেদের ন্যায্য স্থান অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে দেশগুলো একত্রে কাজ করছে। তবে এই সম্মিলিত লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র তথা উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত, যার কূটনৈতিক তৎপরতা ও অনস্বীকার্য যোগ্যতাই জি-ফোর জোটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ দিয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী ভারতকে বাদ দিয়ে জাতিসংঘের সংস্কার কার্যক্রম কোনোভাবেই সম্পন্ন হতে পারে না। বিশ্বশান্তি রক্ষা কার্যক্রমে ঐতিহাসিক অবদান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে দিল্লির নেতৃত্বমূলক ভূমিকা জি-ফোর জোটের প্রতিটি সদস্যকে নৈতিকভাবে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান একচেটিয়া ও স্থবির কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে ভারত কেবল নিজের জন্য নয়, বরং সমগ্র উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থরক্ষার্থে জি-ফোর মঞ্চের সামনের সারিতে থেকে এই কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে সর্বস্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণে ভারত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সংস্কার মানে কেবল পদ বৃদ্ধি নয়, বরং প্রকৃত ক্ষমতার ন্যায্য বণ্টন। ভেটো ক্ষমতা ছাড়া নতুন স্থায়ী সদস্য পদ তৈরি করার যেকোনো চতুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ভারত যেভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে দিল্লি আপস করার রাস্তায় হাঁটবে না।
বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও বিশ্বশান্তির স্বার্থেই নিরাপত্তা পরিষদের মসনদে ভারত, জাপান, ব্রাজিল, জার্মানি এবং আফ্রিকা থেকে একটি দেশের স্থায়ী আসন পাওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে অনিবার্য দাবি।
সান নিউজ / রাজীব