-
মূল অভিযুক্ত: মণিপুরের দীর্ঘমেয়াদী ও ভয়াবহ সহিংসতার জন্য সরাসরি বিজেপি সরকারের চরম উদাসীনতা, রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে কংগ্রেস।
-
দলের শীর্ষ বৈঠক: গত সোমবার দিল্লির কংগ্রেস সদর দপ্তরে মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে মণিপুর সংকট নিয়ে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
-
রাজনৈতিক পালাবদল: উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে স্থায়ী শান্তি, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনতে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হটিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন কংগ্রেস নেতারা।
-
উত্তপ্ত বর্তমান পরিস্থিতি: সাম্প্রতিক সময়ে কাংপোকপিতে রাস্তা অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ এবং সেনাপতি জেলায় দুই যুবকের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও বেশি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে।
-
প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ: কুকি-নাগা এবং মেইতেই-কুকি সম্প্রদায়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অর্ধশতাধিক মানুষ নিখোঁজ এবং বহু জনপদ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।
-
'ইন্ডিয়া' জোটের হুংকার: লোকসভা নির্বাচনে মণিপুরের মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে দাবি করে বিরোধী জোটের নেতারা বলেছেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনেও শাসক দলকে উৎখাত করতে প্রস্তুত সাধারণ মানুষ।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী রণক্ষেত্র মণিপুরে দীর্ঘায়িত অশান্তি এবং লাগাতার রক্তপাতের পেছনে পুরোপুরি শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চরম উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য এবং দায়সারা মনোভাবের কারণেই পাহাড় ও উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে আগামী ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মণিপুরের মাটি থেকে ব্যর্থ সরকারের মূলোচ্ছেদ করে রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করার হুংকার দিয়েছেন কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
গতকাল সোমবার নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে মণিপুরের ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকট ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে একপ্রস্থ চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়।
সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, সাংগঠনিক সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল, মণিপুর বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি সপ্তগিরি উলকা, রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ইবোবি সিং এবং পরিষদীয় দলের প্রধান কে মেঘচন্দ্রসহ অন্যান্য হেভিওয়েট নেতারা।
বৈঠক শেষে মল্লিকার্জুন খাড়গে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের ডবল ইঞ্জিন সরকারের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার খেসারত দিচ্ছে মণিপুরের সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব এখন চোখ বন্ধ করে বসে আছে।
উত্তর-পূর্বের এমন স্পর্শকাতর রাজ্যে স্থায়ী শান্তি, হারানো গৌরব এবং ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনতে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির অপশাসনের অবসান ঘটানোই এখন তাদের প্রধান এজেন্ডা বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি।
রাজনৈতিক নেতাদের কথার লড়াইয়ের বাইরেও মাটির বাস্তবের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। গত কয়েক দিনে কাংপোকপি জেলায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে, বড় বড় কাঠের গুঁড়ি ও পাথর ফেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করে দেয়।
অন্যদিকে, সংবেদনশীল সেনাপতি জেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া দুই তরুণের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের শুরু অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কুকি ও নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া নতুন দাঙ্গায় ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। তামেংলং, নোনে, কামজং, উখরুল ও কাংপোকপি অঞ্চলের একের পর এক জনপদ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে তিন শতাধিক তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, প্রায় অর্ধশত মানুষ এখনও নিখোঁজ এবং হাজার হাজার পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক সুর চড়িয়েছেন। সম্প্রতি রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বিশাল জনসমাবেশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আজ বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে পরিবর্তনের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে।
বিগত লোকসভা নির্বাচনেই মণিপুরের দুই আসনে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করে রাজ্যের জনতা তাদের রায় স্পষ্ট করে দিয়েছিল, আর বিধানসভাতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে।
এদিন উত্তরাখণ্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন এই কংগ্রেস নেতা। তার অভিযোগ, পবিত্র তীর্থক্ষেত্রগুলোকে দুর্নীতির করাল গ্রাসে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের সবুজ প্রাকৃতিক সম্পদ নির্বিচারে বৃহৎ করপোরেট পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে বর্তমান সরকার।
মণিপুরের বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ইস্যুটিকে হাতিয়ার করেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে চাইছে হাত শিবির।
মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভকে সংগঠিত করে শান্তি ও পুনর্মিলনের বার্তা নিয়ে বিজেপি হঠাও স্লোগানকে সামনে রেখে ময়দানে নামার সম্পূর্ণ রূপরেখা তৈরি করে ফেলেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব। এখন দেখার বিষয়, উত্তপ্ত মণিপুরের জনতা ব্যালটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক শক্তির হাতে তাদের ভাগ্য সঁপে দেয়।
সান নিউজ / রাজীব